আজকের সকল শিরোনাম
ফটোগ্যালারি
বৃহস্পতিবার, ঢাকা ॥ ৭ মে ২০১৫ ॥ ২৪ বৈশাখ ১৪২২ ॥ ১৭ রজব ১৪৩৬
সংবাদ শিরোনাম :
বিলুপ্তির পথে গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট
Published : Thursday, 7 May, 2015 at 12:00 AM
এম এইচ রবিন
প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরনো পাঠ্যক্রমে লেখাপড়া চলছে দেশের গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটে। নেই আধুনিক বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পাঠ্যক্রম। এই পাঠ্যক্রমে লেখাপড়া করে শিক্ষার্থীরাও পড়ছেন বিপাকে। এখানকার সার্টিফিকেট সাধারণ শিক্ষার সমমান হলেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। যুগোপযোগী মানবসম্পদ তৈরি না হওয়ায় গুরুত্ব হারিয়েছে এ ইনস্টিটিউটগুলো। একই সঙ্গে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। ফলে বিলুপ্তির পথে এখন দেশের গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটগুলো। এগুলোকে অধিকতর গতিশীল ও যুগোপযোগী করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশে ১৬টি গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট রয়েছে। এসব ইনস্টিটিউটে সাধারণ শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক কারিকুলামে লেখাপড়া হয়। দুই বছরমেয়াদি ‘ডিপ্লোমা ইন-বিজনেস স্টাডিজ (ডিআইবিএস)’ কোর্স এইচএসসি (ব্যবসায় শিক্ষা) কোর্সের সমমান। ২০১৫ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এই ডিআইবিএসের মাত্র ৪ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী সারা দেশ থেকে অংশ নেন। এত কমসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য সম্পূর্ণ পৃথক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষক নিয়োগ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফল তৈরিতে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে। দেশব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এ ইনস্টিটিউটগুলো দেখভাল করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা। এ ইনস্টিটিউটগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছেÑ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, পাবনা, ফরিদপুর, কুমিল্লা, ফেনী, ময়মনসিংহ, যশোর ও কুষ্টিয়া জেলা শহরে। প্রতিষ্ঠালগ্নে এসব ইনস্টিটিউটের খ্যাতি ছিল। কেননা এ প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে কোনো শিক্ষার্থীকে বেকার থাকতে হতো না। কিন্তু বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে টাইপ ও শর্টহ্যান্ডবিষয়ক চাকরি নেই। এখন অফিসগুলোয় এসব পদ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কম্পিউটার অপারেটর ও ডেটা এন্ট্রি পদে পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। ফলে ডিআইবিএসের সনাতন কারিকুলাম ও ডিপ্লোমার প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তির হার।
যুগোপযোগী করার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম খান আমাদের সময়কে জানান, এসব গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটে শিক্ষার্থী-শূন্যতার বিষয়ে তিনি অবগত। নজরুল ইসলাম বলেন, ইনস্টিটিউটগুলোর পর্যাপ্ত অবকাঠামো রয়েছে। এগুলোকে আইসিটি ট্রেনিং সেন্টার বা কম্পিউটার ইঞ্জিরিয়ারিং কলেজ করা যেতে পারে। এতে আইসিটিতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো বিদেশি সংস্থার সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। তবে এসব আমার একান্ত ভাবনা, মন্ত্রণালয়ের কোনো সিদ্ধান্ত নয়। সর্বমহলের সহযোগিতা থাকলে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজও করা যাবে।
শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যান
একটি গভ. ইনস্টিটিউটে দুই বছরের ডিআইবিএস কোর্সে ভর্তিতে এক ব্যাচে ৫০০ জনে উন্নীত হয়নি শিক্ষার্থীর সংখ্যা। আবার যাও বা ভর্তি হয় সেখান থেকেও ঝরে পড়েন অনেক শিক্ষার্থী। অনেকে প্রথম বছর ভালো ফল না করতে পেরে দ্বিতীয় বছর অনিয়মিত পরীক্ষার্থী হয়ে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেন। যেমনÑ গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট ঢাকা থেকে ২০১৪ সালে পরীক্ষায় অংশ নেন ৮৫ জন, চট্টগ্রাম থেকে ৪৪৪, খুলনা থেকে ৫১, রাজশাহী থেকে ১৩১, বরিশাল থেকে ৪২৩, সিলেট থেকে ২৫৯, রংপুর থেকে ৩৭৪, ময়মনসিংহ থেকে ১৯৯, ফরিদপুর থেকে ৩৩৪, ফেনী থেকে ৫৪৬, দিনাজপুর থেকে ৩৬৫, বগুড়া থেকে ৩১৮, কুষ্টিয়া থেকে ২৪৩, কুমিল্লা থেকে ৩৭০, পাবনা থেকে ১৭৭ ও যশোর থেকে ১৫৯ জন।
শিক্ষার্থী হ্রাস প্রসঙ্গে ঢাকা গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটের প্রফেসর একেএম রেজাউল করীম জানান, বর্তমানে আমাদের দেশে কিংবা বিদেশের কোথাও টাইপ ও শর্টহ্যান্ডের প্রচলন নেই। ফলে এ যুগের শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে পড়তে অনাগ্রহী। তার প্রতিষ্ঠানে একটি ছাত্র হোস্টেল দীর্ঘদিন ধরে র‌্যাবের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আবাসিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। চট্টগ্রাম গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ জাফর আহমেদ জানান, টাইপ ও শর্টহ্যান্ড পড়ানোর শিক্ষক ইনস্টিটিউটে নেই।
রাজশাহী গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. গোলাম রাব্বানী বলেন, ইনস্টিটিউটগুলোকে যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। তার মতোই এসব ইনস্টিটিউটের সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করে এগুলোকে অধিকতর গতিশীল ও যুগোপযোগী করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।
এ প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন জানান, গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটে পর্যাপ্ত পরিমাণ জমি ও অবকাঠামো রয়েছে। গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিউটগুলোকে কমার্স কলেজে রূপান্তর করা যেতে পারে। ডিআইবিএস কোর্স এইচএসসি (ব্যবসায় শিক্ষা) কোর্সের সমমান। এই কোর্সে পড়ানো হয় এইচএসসির ব্যবসায় শিক্ষার বিষয়গুলো। এখানে পড়ান বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকরা। কমার্স কলেজে রূপান্তর হলে এই শিক্ষকরাই পাঠদান করতে পারবেন। বর্তমানে দেশ-বিদেশে বিবিএ ও এমবিএ সনদের ব্যাপক চাহিদা। অদূর ভবিষ্যতে এসব ইনস্টিটিউটে বিবিএ ও এমবিএ কোর্স চালুর সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাড়বে শিক্ষার্থীও।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা বলেন, তৎকালীন সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ডিআইবিএস কোর্স কারিকুলাম তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবং বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ডিআইবিএসের পরিবর্তে এইচএসসি (ব্যবসায় শিক্ষা) কোর্স চালু করা অধিক যুক্তিসংগত ও যুগোপযোগী হবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম। ইনস্টিটিউটগুলো পরিচালিত হয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে। সারা দেশে পরীক্ষা পরিচালনার যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্নে জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। কিছু শিক্ষার্থীর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন কারিকুলামে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণ বোর্ডের সামগ্রিক কার্যক্রম ব্যাহত করে।
ডিআইবিএসের শিক্ষার্থীরা জানান, উচ্চ শিক্ষার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স কোর্সে ভর্তির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডিআইবিএস সনদকে এইচএসসির সমমান হিসেবে বিবেচনা করতে চায় না। এতে বিপাকে পড়তে হয় তাদের।
সরকারি ও বেসরকারি অফিসে দক্ষ কর্মচারী সরবরাহের লক্ষ্যে ১৯৬৭ সালে গভ. কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটের যাত্রা শুরু। এখানে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা ভর্তি হয়। বর্তমানে এর কোর্সের নাম ‘ডিপ্লোমা ইন-বিজনেস স্টাডিজ (ডিআইবিএস)’। কোর্সটি এইচএসসি (ব্যবসায় শিক্ষা) কোর্সের সমমান।


সর্বশেষ সংবাদ
সব খবর...
সর্বাধিক পঠিত