আজকের সকল শিরোনাম
ফটোগ্যালারি
শুক্রবার, ঢাকা ॥ ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ॥ ২০ ভাদ্র ১৪২২ ॥ ১৯ জিলকদ ১৪৩৬
সংবাদ শিরোনাম :
দেশী ১২, বিদেশি ৭ ক্রিকেটার নিয়ে এবারের বিপিএল      সূত্রাপুরে বাসায় গ্যাসের চুলা বিস্ফোরিত: ৩জন আহত      যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে: ডা. ইমরান      'হজ নিয়ে আমার মন্তব্য ভুল ছিল না, তবে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছিল'      বাংলাদেশের মন্ত্রীরা হলো জনগণের কর্মচারী: ওবায়দুল কাদের      মুক্ত হয়নি বিচার বিভাগ: খন্দকার মাহবুব      ‘রাজাকার কমান্ডার’ আমজাদ মারা গেছেন      
মণিপুরি ভাষা ও সাহিত্য
Published : Friday, 4 September, 2015 at 12:00 AM
ড. মুকিদ চৌধুরী
হবিগঞ্জে মণিপুরির বসতি প্রধানত চুনারুঘাট থানার গাজীপুরের বিশগাঁওয়ের গোবরখোলা, যাত্রাগাঁও, ফাটাবিল, আবাদগাঁও, শিবনগর, কাটানিপাড়া, কাঁঠালিপাড়া, তুবাতুলি, বনগাঁও, চম্পকনগর, বড়জুম, ছনখলা প্রভৃতি অঞ্চলে। রাজা ভাগ্যচন্দ্রের শাসনামলের (১৭৬৪-১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দ) প্রথম বছরেই এই অভিবাসন শুরু হয়। ত্রিপুরার রাজা রামগঙ্গা মাণিক্য বিশগাঁও অঞ্চলে অবস্থান করার সময় তার নির্দেশে বিশগাঁও অঞ্চলে মণিপুরি বসতি স্থাপন করা হয়। কারণ তখন অন্তর্কোন্দলে, বর্মি আর নাগাদের আক্রমণে ও ধর্মীয় জটিলতায় মণিপুর সংঘাতময় রাজ্যে পরিণত হয়। তারপর অনেক মৈতৈ মণিপুরিরা রাজা পামহৈবার অত্যাচার ও রাজনৈতিক নানা কোন্দলে জর্জরিত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেয় বৃহৎ বাংলার পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম ও ত্রিপুরায়। বর্মিবাহিনীর আক্রমণে, দ্বিতীয় পর্যায়ে, মণিপুরিরা (বিশেষ করে মোইরাং গোত্রের লোকজন) মণিপুর ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়ে বৃহৎ শ্রীহট্টের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি নিশ্চিত করে। তবে উত্তরগাঁও, মাঝেরগাঁও, ছনগাঁও, কোনাগাঁও ও তেতইগাঁওÑ এই পাঁচটি গ্রাম নিয়ে গঠিত ভানুবিল মৌজায় সর্ববৃহৎ অভিবাসন ঘটে মণিপুরিদের।
মণিপুরি জাতিসত্তার আদি বসতি হচ্ছে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত, একটি নৈসর্গিক শোভাঋদ্ধ ভারতের অঙ্গরাজ্য, মণিপুরে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাষার মানুষ মণিপুরে বসতি গড়লেও ভৌগোলিকভাবে তারা সবাই মণিপুরি পরিচয় লাভ করলেও, সাংস্কৃতিক ও জাতিগতভাবে ‘মণিপুরি’ হিসেবে পরিচিত শুধু মৈতৈ (বঙ্গীয় সনাতন হিন্দু, ভাষা মৈতৈ), বিষ্ণুপ্রিয়া  (বঙ্গীয় বৈষ্ণব, ভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া) ও পাঙান (বঙ্গীয় মুসলিম, ভাষা মৈতৈ)-রা। প্রাচীনকালে মণিপুরি সম্প্রদায় ‘ক্যাংলেইপাক’, ‘ক্যাংলেইপাং’, ‘ক্যাংলেই’, ‘মেইত্রাবাক’, ‘মেখালি’ প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল। তবে জাতিগতভাবে মণিপুরিদের সাতটি সম্প্রদায়ে বা গোত্রে ভাগ করা হয়; যথাÑ ‘নিংথাউযা’, ‘লুওয়াং’, ‘খুমান’, ‘মৈর‌্যাং’, ‘অংঅম’, ‘চেংলেই’ এবং ‘খাবা-গণবা’। পরবর্তীকালে এসব সম্প্রদায় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে রূপান্তরিত হয়। ফলে ‘নিংথাউযা’ হয় ‘শান্ডিল্য’, ‘খুমান’ হয় ‘মৌদ্গল্য’, ‘মৈর‌্যাং’ হয় ‘আত্রেয়’ ও ‘অঙ্গীরাশ্ব’, ‘অংঅম’ হয় ‘গৌতম’, ‘লুওয়াং’ হয় ‘কাশ্যপ’, ‘চেংলেই’ হয় ‘বশিষ্ঠ’ ও ‘অঙ্গীরাশ্ব’ এবং ‘খাবা-গণবা’ হয় ‘ভরদ্বাজ’ ও ‘নৈমিষ্য’ সম্প্রদায়।
মণিপুরি রাজা গরীবে নেওয়াজের আমলে (১৭০৯-১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দ) মণিপুরে বাঙালি সনাতন হিন্দুধর্ম, কালানুক্রমে বঙ্গীয় বৈষ্ণব ধর্ম অনুপ্রবেশ করে। দর্শন, শিল্পকলা, সংস্কৃতি, পোশাক-আশাক, ঘরবসতি, উৎপাদন রীতি সবকিছু নিয়ে এই তিন গোত্রবর্গ মণিপুরি হিসেবে ঐক্য গড়ে তুলেছে। তবে ভাষা ও ধর্মমতের ভিন্নতা জাতিগতভাবে ঐক্যের বাঁধন ছিন্ন করতে পারেনি। মণিপুরি সংস্কৃতি ও শিল্পকলা তার যে বিশাল লীলা, পালা, নৃত্য, বাদ্য, গীতিকাব্য, রস নিয়ে বিশ্বজগতে অভিপ্রকাশিত, প্রতিষ্ঠিত, তার দার্শনিক ভিত্তি হচ্ছে বঙ্গীয় বৈষ্ণব দর্শন। তবে এই বঙ্গীয় বৈষ্ণব দর্শন মণিপুরের মাটিতে মণিপুরি চিন্তক ও সাধারণের কৃত্য-আচার চর্চার নিজস্বতার মধ্য দিয়ে স্বাতন্ত্র্য লাভ করেছে। তাই এর রূপ-কাঠামো অন্যরকম নতুন ও বিনির্মিত।
শ্রীহট্টের মণিপুরি জাতিসত্তাকে ভাষার দিক দিয়ে দুভাগে অন্তর্বিভক্ত করা যায় মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া। মৈতৈ ভাষা মণিপুর রাজ্যের রাজভাষা ও শিক্ষাদানের মাধ্যম; যা ১৭ আগস্ট ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এই ভাষার বর্ণমালার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এক-একটি বর্ণের নামকরণ করা হয়েছে মানবদেহের এক একটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নামানুসারে; যেমন ‘ক’-র প্রতিবর্ণ ‘কোক’ (মাথা); ‘স’-র প্রতিবর্ণ ‘সম’ (চুল); ‘ল’-র প্রতিবর্ণ ‘লাই’ (কপাল); ‘ম’-র প্রতিবর্ণ ‘মিৎ’ (চোখ); ‘প’-র প্রতিবর্ণ ‘পা’ (ভ্রু), ‘ন’-র প্রতিবর্ণ ‘না’ (কান) ইত্যাদি।  মণিপুরের প্রথম রাজা পাখংবার (৩৩-১৫০ খ্রিস্টাব্দ) সময় ১৮টি বর্ণ নিয়ে প্রথম প্রবর্তিত হয় মণিপুরি (মৈতৈ) ভাষা। খ্রিস্টীয় সপ্ত শতাব্দী থেকেই মণিপুরি ভাষা সুসংহত রূপ লাভ করে। সপ্তম শতাব্দীতে রাজত্বকারী উরা কোন্থৌবার (শাসনকাল ৫৬৮-৬৫৮ খ্রি.) শাসনামলে চালু করা ব্রোঞ্জ মুদ্রায় খোদাই করা বিভিন্ন বর্ণমালাই এর প্রমাণ বহন করে। বর্তমানে মোট বর্ণসংখ্যা ২৭টি। মহারাজ গরীবে নেওয়াজের আমলে প্রথম বাংলা অক্ষরে মণিপুরি  (মৈতৈ) ভাষা লেখার প্রচলন ঘটে। সেই থেকে বাংলা অক্ষরে মণিপুরি (মৈতৈ) ভাষা লেখা হয়ে আসছে। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ‘মৈতৈ’র পরিবর্তে ব্যবহার হতে থাকে ‘মণিপুরি’ শব্দ, ‘মৈতৈ’ শব্দের সমার্থক শব্দরূপে। অন্যদিকে বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা বঙ্গ-মগধ প্রাচ্য-প্রাকৃত ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। তবে বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায় লিঙ্গ ও বচনভেদে ক্রিয়াপদের পরিবর্তন ঘটে। বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা ও সাহিত্যের প্রধান অঞ্চল হচ্ছে আসাম ও ত্রিপুরা।
মণিপুরি সাহিত্যকে চার ভাগে বিভক্ত করা যায়; যথাÑ (১) ‘প্রাচীন যুগ’ (৩৩-১০৭৪ খ্রিস্টাব্দ), (২) ‘প্রাচীন-মধ্যযুগ’ (১০৭৫-১৭০৮ খ্রিস্টাব্দ), (৩) ‘নবীন-মধ্যযুগ’ (১৭০৯-১৮২৫ খ্রিস্টাব্দ) এবং (৪) ‘আধুনিক যুগ’ (১৮২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান)।
মণিপুরি (মৈতৈ) সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হচ্ছে ‘ঔগ্নী’  (গীতি-শ্লোক, মৌখিক সাহিত্য); যা রাজা পাখংবারের সিংহাসন আরোহণের সময়ে সূর্যদেবের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়। বৈদিক স্তোত্রের মতোই এর গঠনশৈলী। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময় রচিত রাজকীয় ঘটনাপঞ্জি, জীবনাখ্যান, রাজ-ইতিহাস মণিপুরি সাহিত্যের বিপুল আয়তন গড়ে ওঠে। ‘চৈথারোল কুম্বাবা’, ‘নুমিৎকাপা’, ‘পৈরিতোন খুনতোকপা’, ‘পান্থোইবি খোংগুল’ প্রভৃতি রচনা মণিপুরি (মৈতৈ) সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য প্রাচীন নিদর্শন। অন্যদিকে বিষ্ণুপ্রিয়া কাব্যগীতের প্রাচীনতম নিদর্শন হচ্ছে ‘বরণ ডাহানির এলা’ (বৃষ্টি ডাকার গান) ও ‘মাদই সরালেলর এলা’ (মাদই সরালেলের গান)। কৃষিসমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব গান মণিপুরে বঙ্গীয় বৈষ্ণব-দর্শন প্রবেশের অনেক আগেই সৃষ্টি হয়। মাদই-সরালেলের গানে মণিপুরি আদিদেব সরালেল ও মাদই-এর একটা সামাজিক বিশ্বাসগত দ্বন্দ্বের আভাস পাওয়া যায়। বিষ্ণুপ্রিয়াদের মধ্যে ‘আপাঙর য়ারি  বা ‘বোকার জারি’ নামে এক ধরনের লোকগল্প প্রচলিত আছে।
মণিপুরি (মৈতৈ) লিখিত সাহিত্যে চর্চা শুরু হয় ‘নবী-মধ্যযুগ’-এ, মহারাজ গরীবে নেওয়াজের শাসনামলে। তার সময়েই বঙ্গীয় বৈষ্ণব-দর্শন ও বাংলা-সাহিত্যের প্রত্যক্ষ প্রভাবে মণিপুরি সাহিত্য ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। প্রকৃতপক্ষে তখনই ব্যাপকভাবে মণিপুরি সাহিত্য-চর্চা শুরু হয়। বাংলাঞ্চলে মণিপুরি সাহিত্যের যাত্রা শুরু হয় ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে শ্রীফাল্গুগুনী সিংহ সম্পাদিত ‘জাগরণ’ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে। এ সময় আরও কয়েকটি মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার পত্রিকা প্রকাশিত হয়; যেমন ‘মেখলী’ (১৯৩৩), ‘মণিপুরি’ (১৯৩৮), ‘ক্ষত্রিয়জ্যোতি’ (১৯৪৪) ইত্যদি। মহেন্দ্রকুমার সিংহ রচনা করেন মণিপুরের প্রাচীন ইতিহাস। চারণকবি গোকুলানন্দ গীতিস্বামী  সমাজ সংস্কারমূলক নানা গান ও গীতিপালা লিখে পরিবেশন করেন বিভিন্ন অঞ্চলে। ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত লেখকদের মাধ্যমে শুরু হয় ‘আধুনিক যুগ’। আর প্রথম ছাপাখানায় মুদ্রিত মণিপুরি ভাষায় বই প্রকাশিত হয় ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে। বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে সৃষ্টি হন খাইরাকম চাউবা, লমাবম কমল ও হিমজ অঙাংহল; মণিপুরি আধুনিক সাহিত্যের তিন বলিষ্ঠ-পুরুষ, পথপ্রদর্শক। তারাই মণিপুরি ভাষায় প্রথম রচনা করেন আধুনিকাঙ্গিকে কাব্যগ্রন্থ, ছোটগল্প, উপন্যাস ও নাটক; যেমন ‘থায়নগী লৈরাং’ (খাইরাকপম চাউবা-এর কাব্যগ্রন্থ), ‘মাধবী’ (লমাবম কমল-এর উপন্যাস), ‘ইবেম্মা’ (হিমজ অঙাংহল-এর নাটক) ইত্যাদি। এছাড়া হিমজ অঙাংহল-এর ৩৯ হাজার পদে রচিত চিরন্তন প্রেমের মহাকাব্য ‘খাম্বা খোইবী শৈরোং’। পরবর্তীকালে এই তিন মহাপুরুষের সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে এগিয়ে আসেন আশংবম মীনকেতন, লাইশ্রম সমরেন্দ্র সিংহ, এলাংবম নীলকান্ত সিংহ, শ্রী বীরেন, লোং থোম্বক কুঞ্জমোহন সিংহ। তাদের সাহিত্যকর্ম শুধু যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তাই নয়, বরং সমৃদ্ধ করেছে মণিপুরি সাহিত্যকে; ভূষিত করেছে পদ্মশ্রী উপাধিতেও। মণিপুরি (মৈতৈ) নাট্যধারায় রতন থিয়াম, কানাইলাল হিসনামের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মণিপুরের এই দুই বিখ্যাত নাট্যকার ও নির্দেশক মূলত পুরাণের কাহিনিকে নতুন প্রেক্ষাপটে সমকালীন ভাবনায় নাট্যরূপ দিয়েছেন। রতন থিয়ামের ‘চক্রব্যূহ’, ‘ঋতুসংহার’, কানাইলালের ‘কর্ণ’, ‘ডাকঘর’ প্রকৃতি নাটক পুরাণ ও চিরন্তনী সাহিত্য বিনির্মাণের এক দুঃসাহসী মঞ্চ-ইতিহাস।
বাংলাদেশে মণিপুরি  (মৈতৈ) সাহিত্যের চর্চা স্বাধীনতার পরবর্তীকালে বেগবান হয়। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে সংগঠিত ‘মণিপুরি সাহিত্য সংসদ’ এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ১৯৭০-এর দশকের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকরা হচ্ছেন নবকিশোর শর্মা, সোনামণি সিংহ, থোকচোম মণিহার প্রমুখ। এই দশকেই প্রকাশিত হয় ‘মৈরা’। ‘মণিপুরি সাহিত্য সংসদ’-এর প্রকাশিত ‘দ্বীপান্বিতা’ পত্রিকা ছিল মৈতৈ সাহিত্যপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম। পরবর্তীকালে একের পর এক প্রকাশিত হয় ‘মতম’, ‘থাজ’, ‘খোল্লাউ’, ‘অনৌবা মঙাল’, ‘মণিপুরি দর্পণ’, ‘ইপোম’, ‘শজিবু ইচেল’, ‘ঐগ্রী’ প্রভৃতি পত্রিকা। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের ‘মণিপুরি সাহিত্য সংসদ’ মণিপুরি কবিতার বই ‘বসন্ত কুন্নিপালাজি লেইবাং’ প্রকাশ করে। এই সংসদ ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করে বাংলাদেশের মণিপুরি কবিতা। এতে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০ জন মণিপুরি কবির ২০টি কবিতা স্থান পায়। নির্বাচিত ১০ জন কবির মধ্যে ৬ জনই ছিলেন হবিগঞ্জের বিশগাঁও অঞ্চলের। পরবর্তীকালে আরও দুটি মণিপুরি কবিতার বই প্রকাশিত হয়; যথা ‘ম্যাং মাপেই মারাকটা’ এবং ‘ওয়াখালসি নাচোম’। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে মণিপুরি (মৈতৈ) ভাষায় দুই ডজনের মতো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ‘মণিপুরি সাহিত্য সংসদ’, ‘ঈনাৎ পাবলিকেশন’, ‘হামোম পাবলিকেশন’ প্রভৃতি প্রকাশনা এসব গ্রন্থ প্রকাশ করে। বাংলাদেশে মণিপুরি (মৈতৈ) সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্যিক হচ্ছেন একে শেরাম, কারাম নীলবাবু, খোইরোম ইন্দ্রজিৎ, কন্থৌজম সুবোধ সিংহ, শেরাম শরৎ, সনাতন হামোম, এন শ্যামল, অহৈবম রনজিৎ কুমার সিংহ প্রমুখ। উল্লেখযোগ্য কবি হচ্ছেন হামোম প্রমোদ, শেরাম নিরঞ্জন, সামব্রম শংকর, মতুম অপু, থোঙাম সঞ্জয়, কন্থৌজম সুরঞ্জিত, শ্যামল সিংহ, শেরাম রিপন প্রমুখ।
১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ‘ফাগু’, ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে ‘পাঞ্চজন্য আর্জ্জুনী’, ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ‘প্রতিশ্রুতি’ ইত্যাদি বিষ্ণুপ্রিয়া পত্রিকা প্রকাশিত হয়। কবিতায় বিষ্ণুপ্রিয়া পথিকৃৎ হিসেবে আবির্ভূত হন ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ (ছদ্মনাম ধনঞ্জয় রাজকুমার)। আবির্ভূত হন বিষ্ণুপ্রিয়া কবি-সাহিত্যিক সেনারূপ সিংহ, মদনমোহন মুখোপাধ্যায়, জগৎমোহন সিংহ, বিমল সিংহ প্রমুখ। সেনারূপ সিংহের ‘আনৌপী’ ছন্দ, গীতিতে একটি অনবদ্য কাব্যগ্রন্থ। মদনমোহন মুখোপাধ্যায়ের কাব্যাবেগের শক্তি অসাধারণ। বিমল সিংহের বাংলায় লেখা ‘ইঙেললেইর মেয়ের বিয়ে’ গল্পটি বিষ্ণুপ্রিয়া সমাজের নৃতাত্ত্বিক সাহিত্যিক ভাষ্য হিসেবে বেশ আলোচিত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিষ্ণুপ্রিয়া সাহিত্যচর্চা সুস্পষ্টত শুরু হয়। প্রকাশিত হতে থাকে বিষ্ণুপ্রিয়া পত্রিকা ‘ত্রিপুরা চে’ (১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান পর্যন্ত), ‘এবাকা’ (১৯৮০), ‘নুয়া এলা’ (১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান পর্যন্ত) প্রভৃতি। ‘লোকতাক’, ‘পঞ্চশ্রী’, ‘কাকেই’, ‘সরালেল’, ‘আমার পৌ’, ‘চেতনা’ প্রভৃতি ছোট কাগজ ও সাহিত্য-পত্রিকা উল্লেখযোগ্য। প্রকাশিত হয় ‘খংচেল’ (১৯৭৩), ‘ইমার ঠার’ (১৯৭৯), ‘মিঙাল’ (১৯৮১), ‘সত্যম’ (১৯৮১), ‘পৌরি’ (১৯৮৯), ‘জাগরণ’ (১৯৯১), ‘যেবাকা যেদিন’ (১৯৯১), ‘ইথাক’ (১৯৯৪)  ইত্যাদি সাহিত্য-সংস্কৃতির পত্রিকা। চাম্পালাল সিংহ, মথুরা সিংহ, দিলস্ লক্ষ্মীন্দ্র সিংহ, সমরজিৎ সিংহ, বিশ্বজিৎ সিংহ, রঞ্জিত সিংহ প্রমুখ কবি ভাষার নতুনত্বে, চিন্তার অভিনবত্বে এবং জাতিগত রাজনৈতিক বীক্ষায় গড়ে তুলছেন বিষ্ণুপ্রিয়া কাব্যসাহিত্যের সৌধ। রঞ্জিত সিংহের কবিতা অনন্য রূপকল্প, জীবনবোধে শান্তি সমাহিত ও রাজনীতিস্পর্শী। সমরজিৎ সিংহ বাংলা সাহিত্যেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। কাব্যকলা বিশ্বজিৎ সিংহের কবিতাকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য সত্তা। মথুরা সিংহ পরিমিত হাস্যরসের দক্ষতায় কবিতাকে করেছেন ভাস্বর। কবিতার আকাশে উদয় হন রণজিত সিংহ, গোপীচাঁদ সিংহ, সুখময় সিংহ, শুভাশিস সিনহা প্রমুখ। বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায় সংগ্রাম সিংহ ‘ইথাক’ পত্রিকা; সুশীলকুমার সিংহ ‘পৌরি’ মাসিক পত্রিকা;  সুমন সিংহ ‘গাওরাপার’-এর কয়েকটি সংখ্যা; অঞ্জন সিংহের সম্পাদনায় ‘কুমেই’ দ্বিমাসিক সাহিত্যপত্রিকা; শুভাশিস সিনহা অনিয়মিতভাবে ‘মণিপুরি থিয়েটার’-এর পত্রিকা প্রকাশ করে আসছেন। কথাসাহিত্যে অমরেন্দ্র সিংহ, ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ, বিমল সিংহ, অনুকুল সিংহ, স্মৃতিকুমার সিংহ, জ্যোতিপ্রকাশ সিংহ, গীতা মুখার্জি, সুরেন্দ্র কুমার সিংহ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। ভাষা-বিষয়ক গবেষণায় আছেন ড. কালীপ্রসাদ সিংহ, পরবর্তীকালে মঙ্গল বাবু সিংহ, দিলস লক্ষ্মীন্দ্র সিংহ প্রমুখ। সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধে বরুণ কুমার সিংহ, ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ প্রমুখ প্রথম সারিতে আছেন। প্রবন্ধ ও গবেষণাধর্মী রচনায় সক্রিয় আছেন রণজিত সিংহ। এছাড়া রাজকান্ত সিংহ, রসমোহন সিংহ, চন্দ্রকুমার সিংহ, শ্যামাকান্ত সিংহ, রামকান্ত সিংহ, সুকুমার সিংহ বিমল, উত্তম কুমার সিংহ, সুশীল কুমার সিংহ, অসীম কুমার সিংহ, হেমন্তকুমার সিংহ প্রমুখ নবীন-প্রবীণ লেখক বাংলা ও বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায় উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। নাট্যকার হিসেবে শুরুতেই উল্লেখযোগ্য ইন্দ্রকুমার সিংহের নাম। তারপর  ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ, অশ্বিনী কুমার সিংহ, নন্দেশ্বর সিংহ, রণজিত সিংহ, শুভাশিস সিংহ প্রমুখ লেখক। বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায় উপন্যাস রচনায় আছেন প্রভাস কান্তি সিংহ, জ্যোতিপ্রকাশ সিংহ, সমরজিৎ সিংহ প্রমুখ লেখক। অনুবাদসাহিত্যে ধনঞ্জয় রাজকুমারের নাম অগ্রগণ্য। দিলস লক্ষ্মীন্দ্র সিংহও অনুবাদকর্মে ব্যাপৃত আছেন।
বাংলাদেশের পাঙনদের মধ্যে সাহিত্যচর্চার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক হচ্ছেন সাজ্জাদুল হক স্বপন। তার সম্পাদনায় ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় ‘অনৌবা খোংদাং’ (নবযাত্রা)। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে সাজ্জাদ সাহের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘প্রত্যয়’ পত্রিকা। এছাড়া রয়েছেন প্রাবন্ধিক মো. আবদুল মজিদ, খুরশেদ আলী প্রমুখ। ‘মণিপুরি রাইটার্স ফোরাম’ থেকে পাঙনদের জন্য একটি বৃহৎ গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ইতোমধ্যে।

লেখক : নাট্যকার ও গবেষক



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত