আজকের সকল শিরোনাম
ফটোগ্যালারি
বৃহস্পতিবার, ঢাকা ॥ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ॥ ২৯ মাঘ ১৪২২ ॥ ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৭
সংবাদ শিরোনাম :
কক্সবাজারে ডেইলি স্টার সম্পাদকের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা      শাহজালালে ব্যাক্তির শরীরে আড়াই কেজি স্বর্ণ      হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রশংসায় বার্নিকাট      কৃষি সচিব হচ্ছেন আনোয়ার ফারুক       ‘মন্ত্রীরা বেতন নেয় বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার করার জন্য’      নিজস্ব ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চালাতে ব্যর্থ হলে ব্যবস্থা: শিক্ষামন্ত্রী      কারিনার ‘ক্লিন ঢাকা’ কনসার্ট স্থগিত      
সাগর-রুনি হত্যাকা-ের ৪৮ মাস
‘৪৮ ঘণ্টা’র উপহাস
Published : Thursday, 11 February, 2016 at 12:00 AM, Update: 11.02.2016 1:56:56 AM
হাবিব রহমান
‘৪৮ ঘণ্টা’র উপহাসবুক শেলফে থরে-থরে সাজানো বই। একসময় এসব পড়তেন সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। হত্যাকা-ের শিকার এই সাংবাদিক দম্পতি পৃথিবীতে নেই চার বছর। তবে তাদের লেখা বইগুলোর পাঠক আছে এখনো। এই দম্পতির একমাত্র সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘের হাতে মাঝে-মাঝে ওঠে বাবা-মায়ের বই। এভাবেই হয়তো একসময় বইগুলো পড়া শেষ করবে মেঘ। কিন্তু তার বাবা-মায়ের বিচার আদৌ শেষ হবে কিনা তা জানে না পরিবারের কেউ।
মেঘের মামা নওশের রোমানের ভাষায়Ñ বিচার দূরের কথা, এত দিন হয়ে গেল তদন্তের প্রাথমিক অগ্রগতিও দেখাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিচারের পুরো বিষয়টি অবহেলা করছে রাষ্ট্র। বিচার করতে রাষ্ট্রের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। তাই বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না। মেঘের কাছে কী জবাব দেবে এই রাষ্ট্র?
গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর ইন্দিরা রোডের বাসায় এভাবেই হতাশার কথা বলছিলেন রোমান। মেঘ এখন ওই বাড়িতেই নানি ও মামার সঙ্গে থাকে।
বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকা-ের চার বছর পূর্ণ হলো আজ। দীর্ঘ সময়েও নৃশংস এ হত্যাকা-ের রহস্য উদ্ঘাটিত না হলেও নানা নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। কারা, কেন সাগর-রুনিকে হত্যা করল তার ধারে-কাছেও যেতে পারেনি তারা। তদন্তে কোনো অগ্রগতি না থাকলেও গত চার বছরে ৪০টি অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে বর্তমান তদন্ত সংস্থা র‌্যাব। দফায়-দফায় সময় নেওয়া হয়েছে আদালত থেকে। ৫ দফায় বদল হয়েছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারে পাঠানো হত্যার আলামত থেকে পাওয়া ডিএনএ প্রতিবেদনও পেয়েছে র‌্যাব। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। ওই নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে ২২ জন অপরাধীর ডিএনএ নমুনা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। এখন পুরো ব্যাপারটি নিয়ে ধোঁয়াশা না কাটলেও তদন্ত সংস্থা র‌্যাবের দাবি, মামলার তদন্ত সঠিক গতিতে চলছে। সময়মতো সবকিছু জানা যাবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসা থেকে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙার বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় হত্যামামলা দায়ের করা হয় শেরেবাংলা নগর থানায়। প্রথমে তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ওই থানার এক সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই)। একদিন পর চাঞ্চল্যকর এ হত্যামামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) ন্যস্ত করা হয়। ৬২ দিনের মাথায় হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। এরপর আদালতের নির্দেশে ওই বছর এপ্রিলে তদন্তভার নেয় র‌্যাব। ভিসেরা পরীক্ষার জন্য সাগর-রুনির লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে সংস্থাটি। ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী মেঘের সঙ্গে দফায়-দফায় কথাও বলে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ঘটনাস্থলে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার করা হবে। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও খুনিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনকি কারা এ খুনের সঙ্গে জড়িত তাও জানা যায়নি। ঘটনার দুদিন পর তৎকালীন পুলিশ প্রধান হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছিলেন, তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে সবই এখন কথার কথা হিসেবেই প্রতীয়মান। ‘৪৮ ঘণ্টা’ এবং ‘প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি’ এখন যেন কেবলই উপহাস! এরই মধ্যে গতকাল আশ্বাস দিয়েছেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। জয়পুরহাটে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিনি বলেন, বর্তমানে সাগর-রুনি হত্যাকা-ের তদন্তভার র‌্যাবকে দেওয়া হয়েছে। র‌্যাব উচ্চ আদালতের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করছে। এ সাংবাদিক দম্পতির হত্যারহস্য যে কোনো দিন উন্মোচিত হবে।
গতকাল সন্ধ্যায় নওশের রোমানের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, স্কুলশেষে কোচিং করে বাসায় ফিরেছে মেঘ। এসেই ড্রয়িংরুমে বাবা-মায়ের বইগুলোর দু-একটি হাতে নেয়। হত্যাকা-ের পর পুরনো বাসা থেকে বইগুলো রোমানের বাসায় নিয়ে আসা হয়। আলী ইমামের লেখা ‘কিশোরসমগ্র’ ইতোমধ্যে তার প্রিয় হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ পরই কম্পিউটার খুলে বসে গেমস খেলার জন্য। বাবা-মায়ের অবর্তমানে পড়াশোনা ও খেলাধুলায় এভাবেই মেঘের জীবন কাটছে। গুলশানে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটরিয়াল স্কুলের স্ট্যান্ডার্ড থ্রিতে পড়ছে মেঘ। রোমান আমাদের সময়কে বলেন, শুরুর দিকে এক ধরনের ট্রমার মধ্য দিয়েই মেঘকে যেতে হয়েছে। এখন সেই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে মেঘ।
হত্যাকা-ের পর মেঘের যারা দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন তাদের কেউই পরবর্তী সময়ে তার কোনো খোঁজ নেননি বলে জানান রোমান। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তিত হলেও গত মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো সাগর-রুনির পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে আসেন তিনি। বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তার নাম সিনিয়র এএসপি মহিউদ্দিন।
মেঘের নানি নূরুন নাহার মির্জা বলেন, তাদের কতই বা বয়স হয়েছিল। তারা তো কারো ক্ষতি করেনি। এটা মেনে নেওয়া যায় না। মেঘের বয়সই বা কত। খুব কষ্ট লাগে। বিচার হবে না জানি। এতদিন হয়ে গেল, এখন বিচার পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাই আল্লাহর কাছে বলি, তুমি তো দেখেছ। তুমিই বিচার করো।
মেঘের জন্য সবার কাছে দোয়া চান তিনি। এ সময় তার কণ্ঠ ভারি হয়ে আসছিল। চোখের কোণে বুকের মানিক হারানোর অশ্রু।
এদিকে তদন্তভার নেওয়ার পর র‌্যাব জানিয়েছিল, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা সাগর-রুনির রক্তমাখা জামাকাপড়, বঁটি, মোজাসহ কিছু আলামত পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ প্রতিবেদন হাতে এলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু ২০১৪ সালের মার্চে সেই ডিএনএ প্রতিবেদন পাওয়ার পরও র‌্যাব ‘পরিষ্কার’ কিছু জানাতে পারেনি আজ পর্যন্ত।  
অন্যদিকে মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তারকৃত আটজনের কেউই এখন পর্যন্ত হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করেননি। তবে তাদের মধ্যে সাগর-রুনির বাসার নিরাপত্তা প্রহরী এনামুল হক ও পলাশ রুদ্র পাল নামে দুজন ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ১৬১ ধারায় জবানবন্দি দেন। গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হলেনÑ রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মো. সাইদ, মিন্টু, কামরুল হাসান অরুণ ও নিহত দম্পতির বন্ধু তানভীর রহমান। তাদের মধ্যে প্রথম পাঁচজন ২০১৩ সালের আগস্টে মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণ চন্দ্র হত্যার ঘটনায় র‌্যাব ও ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন।
এ হত্যাকা-ের ঘটনায় এ পর্যন্ত ১৫৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র‌্যাব। এর মধ্যে ২৭ জন সাংবাদিকও রয়েছেন। র‌্যাব বলছে, ঘটনার শিকার যেহেতু সাংবাদিক দম্পতি তাই জিজ্ঞাসাবাদের তালিকায় কিছু সাংবাদিকের নাম চলে এসেছে।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, সব ধরনের পন্থা অবলম্বন করে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। মামলাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় এটির রহস্য উদ্ঘাটনে একটু বেশি সময় লাগবে।
র‌্যাব কর্মকর্তার এমন বক্তব্যের ওপর আস্থা আছে কি-না জানতে চাইলে রোমান বলেন, একটি মামলার তদন্ত করতে কতদিন সময় লাগে? এভাবে আর কতদিন? আস্থা থাকে কীভাবে?
 


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত